শেয়ার বাজার

পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসা দুই চিতাবাঘ ফেরত নিতে চায় না জিম্বাবুয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসা দুই চিতাবাঘ ফেরত নিতে চায় না জিম্বাবুয়ে

অবৈধভাবে পাচার হয়ে বিভিন্ন হাত ঘুরে বাংলাদেশে পৌঁছানো দুটি চিতাবাঘকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে জিম্বাবুয়ের সরকার। দীর্ঘদিন ধরে সাফারি পার্কে থাকা এই বন্যপ্রাণীগুলোকে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর সবরকম কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আফ্রিকার এই দেশটির এমন অবস্থানে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২০১৮ সালে, যখন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খাঁচাবন্দী অবস্থায় এই দুটি চিতাবাঘ উদ্ধার করে। বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের হাত থেকে উদ্ধারের পর সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকেই প্রাণী দুটি বিশেষ তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই পার্কে বসবাস করে আসছে।

উদ্ধারের পর থেকেই চিতাবাঘগুলোকে তাদের নিজ আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জিম্বাবুয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনা ও পত্রালাপের পরও জিম্বাবুয়ে সরকার তাদের ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তবে কী কারণে তারা এই বন্যপ্রাণীগুলোকে গ্রহণ করতে চাইছে না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি।

বর্তমানে জিম্বাবুয়ের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না মেলায় গাজীপুর সাফারি পার্কের হাসপাতালেই বিশেষ পরিচর্যায় রাখা হয়েছে চিতাবাঘ দুটিকে। পার্কের অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জন ও কর্মীরা তাদের সার্বিক স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনে প্রাণী দুটির আজীবন লালন-পালনের বিষয়টি এখন পার্কের পক্ষ থেকেই নিশ্চিত করা হচ্ছে।

মেঘনায় ট্রলারডুবি, ৩ ভাই–বোনের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মেঘনায় ট্রলারডুবি, ৩ ভাই–বোনের মরদেহ উদ্ধার

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনার দুদিন পর একই পরিবারের তিন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে তাদের মৃতদেহগুলো উদ্ধার করেন স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা ও স্বজনরা। মর্মান্তিক এই ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে ভিড় করছেন স্থানীয়রা।

নিহত তিন শিশু সম্পর্কে আপন ভাই-বোন। গত কয়েকদিন আগে মেঘনা নদীতে একটি ট্রলারডুবির আকস্মিক দুর্ঘটনায় তারা নিখোঁজ হয়েছিল। ঘটনার পর থেকেই তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় লোকজন নদীতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর অবশেষে নদী থেকে তাদের নিথর দেহগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

তবে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন শিশুদের বাবা হেলাল উদ্দিন। তাকে খুঁজে পেতে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্টগার্ডের যৌথ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজ বাবাকে দ্রুত উদ্ধারের আশায় নদীপাড়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় প্রশাসন ও নদী নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন বা নদীপথে সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতির কারণে প্রায়ই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে নদীপথে চলাচলকারী সকল জলযানকে আরও সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবা, মুখে রুটি তুলে দিচ্ছিল ছোট্ট মেয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবা, মুখে রুটি তুলে দিচ্ছিল ছোট্ট মেয়ে

বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার চরম অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, অসহায় ওই বাবার মুখ দিয়ে খাওয়ার মতো পরিস্থিতি না থাকায় তাঁর ছোট্ট শিশু মেয়েটি পরম যত্নে নিজ হাতে মুখে রুটি তুলে খাওয়াচ্ছে। এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ হতবাক ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি উজিরপুর এলাকায় দিনমজুর ওই ব্যক্তিকে কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চুরির অপবাদ দেন। এরপর তাকে একটি গাছের বা ঘরের খুঁটির সঙ্গে প্রকাশ্য দিবালোকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বিচারের নামে এই ধরনের অমানবিক নির্যাতন চালানোর সময় উৎসুক জনতা ভিড় করলেও কেউ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি। বরং এই দৃশ্য ভিডিও করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সেই দৃশ্যটি দেখে বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে গভীর রক্তক্ষরণ হয়েছে, যেখানে একজন অবুঝ শিশু তার নির্যাতিত বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই প্রকাশ্য রাজপথে এভাবে একজন মানুষকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে হেনস্তা করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এমন বর্বরোচিত আচরণ করার অধিকার কারো নেই বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন নাগরিকরা।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে বলে জানা গেছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে এবং ঘটনার নেপথ্যে থাকা দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই অমানবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।


‘সাহেব সিন্ডিকেট’ ছাড়া দুবলার চরে শুঁটকি বিক্রি মানা

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬

‘সাহেব সিন্ডিকেট’ ছাড়া দুবলার চরে শুঁটকি বিক্রি মানা

সুন্দরবনের দক্ষিণাংশে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা একটি অনন্য দ্বীপের নাম দুবলার চর। বাগেরহাটের শরণখোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ঘেরা দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ সুযোগ নিয়ে শুঁটকি মাছ কেনাবেচা ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘সাহেব সিন্ডিকেট’। তারা ছাড়া অন্য কেউ শুঁটকি বিক্রি করতে পারেন না। পর্যটকদের পকেট কেটে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দুবলার চর গিয়ে এ সিন্ডিকেটের সন্ধান পাওয়া যায়। জেলেদের অভিযোগ ও ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতির বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতি কেজি লইট্টা ও ছুরি শুঁটকিতে ২-৪শ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সে হিসেবে সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে চলতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকা ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

শুঁটকি মাছ কেনাবেচা ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘সাহেব সিন্ডিকেট’। তারা ছাড়া অন্য কেউ শুঁটকি বিক্রি করতে পারেন না। পর্যটকদের পকেট কেটে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।-দুবলা নিউমার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ

পর্যটক ও স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বনবিভাগের সহযোগিতায় ‘সাহেব’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী মিলে এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামে এসব সিন্ডিকেট সদস্য পর্যটকদের কাছে কয়েকগুণ বেশি দামে শুঁটকি বিক্রি করছেন। একদিকে স্থানীয় সাধারণ জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ঠকছেন পর্যটকরা। এতে সুন্দরবন ঘিরে গড়ে ওঠা হাজার কোটি টাকার পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুঁটকি উৎপাদনের জন্য দুবলার চর দেশের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নভেম্বর থেকে মার্চ সময়টিতে মূলত শুঁটকি উৎপাদন ও বেচাকেনা চলে। প্রতি বছর শীত মৌসুমের এ সময়টিতে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে হাজারো জেলে দুবলার চরে গিয়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। সাগর থেকে ধরা লইট্টা, ছুরি, ফাইস্যা, পোয়া, টেংরা, তপসি, চাপিলা, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন জেলেরা। বাঁশের মাচায় খোলা রোদে মাছ শুকিয়ে প্রস্তুত করা এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়।

গত ১৩ জানুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, দুবলার চরের জেলেপল্লিতে জেলেদের শত শত অস্থায়ী ঘর। সামনে মাছ শুকানোর মাচা। তবে সময়টিতে মাছের জোগান না থাকায় মাচাগুলোতে তেমন মাছ ছিল না। জেলেপল্লির সামনে সৈকত লাগোয়া চরে চারটি অস্থায়ী দোকানে শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে।

এখানে আগে থেকেই আটটি ট্রান্সপোর্ট ছিল। এবছর থেকে পর্যটকদের মধ্যে ট্রান্সপোর্টগুলোর মাধ্যমে শুঁটকি বিক্রি করা হচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে বনবিভাগ থেকে এর মধ্যে চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে সাড়ে ১১ টাকা রাজস্ব আসে।- বনবিভাগের দুবলা জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায়

সূর্য ততক্ষণে অস্ত গেছে। পর্যটকদের জাহাজে ফেরার তোড়জোড়। শেষ মুহূর্তে দোকানগুলোতে ভিড় করেন আগ্রহী পর্যটকরা। দোকানি যে দামই চাইছেন, তড়িঘড়ি করে সে দামেই শুঁটকি কিনছেন তারা। অনেক পর্যটক শুঁটকির দাম সম্পর্কে অবগত না থাকলেও যারা নিয়মিত শুঁটকি খান, দুবলার চরে শুঁটকির দাম শুনে তারা হতবাক। খুলনা কিংবা চট্টগ্রামে খুচরা দোকানে যে দামে শুঁটকি বিক্রি হয়, একই শুঁটকি দুবলার চরের ওই চার দোকানে বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি দামে।

ঠকছেন জেলেরা

দুবলার জেলেপল্লির বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় বার্তাবেলা নিউজের। জেলেদের অভিযোগ, তারা উৎপাদন পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য পান না। কিন্তু সিন্ডিকেট করে পর্যটকদের কাছে সেই শুঁটকি অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। পর্যটকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা ভাগবাটোয়ারা হয় সিন্ডিকেট সদস্য ও বনবিভাগের মধ্যে।

সাতক্ষীরার তালা থানা এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত বিশ্বাস শুঁটকি মৌসুমে পাঁচ মাসের জন্য অন্য জেলেদের মতো দুবলার চরে যান। বনবিভাগ থেকে অনুমতি নেওয়া লোকদের কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। আগের বছরগুলোতে শুকানো শুঁটকি দুবলার চরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও বিক্রি করতে পারতেন। তাতে কিছুটা লাভবান হতেন মাছ শুকানোয় জড়িত জেলেরা। পর্যটকরাও বাজারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম দামে শুঁটকি কিনতে পারতেন। তবে চলতি মৌসুম থেকে সেই সুযোগ পাচ্ছেন না পর্যটক ও সাধারণ জেলেরা।

প্রশান্ত বিশ্বাস বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যটকদের কাছে সরাসরি মাছ (শুঁটকি) বিক্রি করতে পারি না। এবছর সাহেবদের দোকানে শুঁটকি বেচাকেনা করতে হবে। দুবলায় চার-পাঁচজন সাহেব আছেন। কামাল সাহেব, পিন্টু সাহেব, হক সাহেব আছে। তাদের দোকান ছাড়া পর্যটকরা শুঁটকি কিনতে পারবে না। আমরাও পর্যটকদের কাছে সরাসরি শুঁটকি বিক্রি করতে পারবো না।’

তারা অতিরিক্ত দাম নিলেও নিতে পারেন। কিন্তু রাজস্বের বাইরে আমরা কিছু দেখি না। যে দোকানগুলো বসেছে, তারাই (ট্রান্সপোর্ট মালিক) আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন যেহেতু একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ আসছে, সেখানে আরও কিছু দোকান বসানোর কথা বলবো।- বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী

তৈরি শুঁটকি কোথায় পাঠানো হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে শুঁটকি পাঠাই। ছোট সাইজের ছুরি শুঁটকি ৪শ, ৫শ, ৬শ টাকা, মাঝারি ৮শ থেকে এক হাজার টাকা বিক্রি হয়। এখানকার সাহেবদের দোকানগুলোতে অধিক দামে বিক্রি হয়। এতে সাধারণ জেলেরা লাভবান হতে পারছেন না।’

জেলে মাধব দাশ বলেন, ‘দুবলার চর থেকে শুধু পর্যটকেরা শুঁটকি কেনেন, তা কিন্তু নয়। এখান থেকে শুঁটকি চট্টগ্রাম, সৈয়দপুরসহ নানান জেলায় পাইকারি পাঠানো হয়। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে মাছের দাম বাড়ে কমে। নদীতে মাছ কম পাইলে দাম বেশি হয়। বেশি পাইলে দাম কম হয়।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর থেকে জেলেদের চাতাল থেকে সরাসরি পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রি নিষেধ হয়ে গেছে। আমরা যারা মাছ শুকাই তারা বিক্রি করতে পারব না। এখন পর্যটকদের শুঁটকি বিক্রির জন্য আলাদা দোকান বরাদ্দ হয়েছে। নির্ধারিত ওই দোকানগুলো থেকে পর্যটকদের শুঁটকি কিনতে হবে।’

জেলে মিলন বিশ্বাস বলেন, ‘এখানকার চারটি দোকানে জেলেদের কাছ থেকে মণ ২০ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে ৩৫-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। বড় ছুরি মাছ আমাদের কাছ থেকে নিলে ৭শ ৮শ, ৯শ টাকা, মাঝারি ছুরি ৬শ-৭শ টাকা। এখন সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। ছোট-মাঝারি ছুরি বিক্রি করছে ৮শ থেকে ১২শ টাকায়।’

আরেক জেলে পিযুষ বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাতক্ষীরা থেকে এসেছি মাছ ধরতে। এবার আমরা ১২ লাখ টাকা খরচ করে এখানে পৌঁছেছি। এখানে আসার তিনদিন পর জেনেছি এখানে সিন্ডিকেট হয়েছে। সিন্ডিকেটের লোকজন বাসা তৈরি করে স্পেশালভাবে মাছ বিক্রি করছে। আগে পর্যটকদের কাছে আমরা মাছ বিক্রি করতে পারতাম। এখন বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকা জরিমানা।’

তিনি বলেন, ‘এখন সাহেবরা (প্রভাবশালীরা সাহেব হিসেবে পরিচিত) মাছ বিক্রি করেন। উচ্চ লেবেলের সাহেবরা মিলে সিন্ডিকেট করেছেন। টোকন সাহেব, কামাল সাহেব, সব সাহেবরা মিলে সিন্ডিকেট করেছেন। গত বছর যে দামে পর্যটকদের কাছে মাছ বিক্রি করেছি, এবছর বিক্রি করতে পারছি না। আমরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত। পর্যটকরা আগের বছর ৪শ-৫শ টাকায় যে মাছ কিনেছে, এবছর কিনতে হচ্ছে এক হাজার টাকায়। তারাও (পর্যটকরা) মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছে।’

ছোট একটি গাগড়া টেংরা শুঁটকি দেখিয়ে পিযুষ বলেন, ‘এই মাছ কেজি একশ টাকায় কিনে দোকানগুলোতে ৪শ টাকায় বিক্রি করছে। তারা সিন্ডিকেট করে বিক্রি করছে। একই মাছ আমরা দেড়শ-দুইশ টাকায় বিক্রি করতাম।’

মৌসুমে ২ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন সুন্দরবন

শীত মৌসুমে সুন্দরবনে ট্যুর পরিচালনাকারীদের সংগঠন ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) তথ্যমতে, সুন্দরবনে পর্যটকদের সেবা দেয় ৮০টির মতো জাহাজ। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত তারা ট্যুর পরিচালনা করে। বনবিভাগের নিয়ম অনুযায়ী একটি জাহাজ এক ট্রিপে ৭৫ জনের বেশি পর্যটক নিতে পারেন না। চাহিদা অনুসারে সপ্তাহে দুটি ট্যুর পরিচালনা করে জাহাজগুলো। দুই লাখের মতো পর্যটক প্রতি মৌসুমে সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে কমবেশি একলাখ পর্যটক দুবলার চর ভ্রমণে যান।

সুন্দরবনে বড় ট্যুর পরিচালনাকারী হলিডেজ শিপিং লাইনস। তাদের দুটি উন্নত ক্রুজ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবুল ফয়সাল মো. সায়েম বাবু টোয়াসের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। দুবলার চরে শুঁটকি সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুন্দরবন ট্যুরে ৭০টি জাহাজ রয়েছে। প্রতি সিজনে কোনো কোনো জাহাজ ৪০টির মতো ট্যুর করে। প্রতি ট্যুরে ৭০ জনের মতো পর্যটক থাকে। সুন্দরবনে গেলে পর্যটকেরা দুবলার চরে যান।’

তিনি বলেন, ‘দুবলায় আগে যে লইট্টা মাছ ৩শ টাকায় বিক্রি হতো, এবার সেটা সাড়ে ৭শ-৮শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দুবলায় যাওয়া পর্যটকরা অতিরিক্ত দামে শুঁটকি কিনে প্রতারিত হচ্ছে। এখন দেশে নির্বাচনের হাওয়া চলছে। নির্বাচনের পরপরই আমরা বিষয়টি বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জানাবো।’

চার দোকান ছাড়া বিক্রি করতে পারে না শুঁটকি

চলতি মৌসুমে দুবলার চরে চারটি দোকানে পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে। সেগুলো হলো- সাগর ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, সুন্দরবন সাউথ জোন ট্রান্সপোর্ট ও মেসার্স নিউ রামপাল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি। জাগো নিউজের হাতে আসা সাগর ট্রান্সপোর্টের একটি রসিদে লেখা রয়েছে- ‘দুবলার চরে রসিদ ব্যতীত শুঁটকি ক্রয় আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ।’

সাড়ে ১১ টাকা রাজস্বের জন্য শুঁটকির দামে অস্থিরতা

দুবলা নিউ মার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ। রসিদে ‘প্রোপ্রাইটর বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহম্মদ’ লেখা রয়েছে। কামাল আহম্মদের ভাষ্য- দুবলায় তার নিজের তিনটিসহ ছয়টি পরিবহন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাগর ট্রান্সপোর্ট ও মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি ও বিলাস ট্রান্সপোর্টের মালিক তিনি।

দোকানগুলোতে কোরাল, রূপচাঁদা শুঁটকি প্রতি কেজি ৪ হাজার টাকা, লইট্টা ৮শ থেকে ১১শ টাকা, ছোট ছুরি শুঁটকি ১ হাজার থেকে ১৪শ টাকা, বড় চিংড়ি ১৩শ টাকা, ছোট চিংড়ি পোনা ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ পর্যটক লইট্টা ও ছুরি শুঁটকিই কেনেন।

কামাল আহম্মদ বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘দুবলায় প্রতি বছর এক লাখ পর্যটক বেড়াতে যান। কেউ এক কেজি, দুই কেজি, পাঁচ কেজি শুঁটকি কেনেন। বনবিভাগের হিসাব মতে, বছরে ৪-৫ লাখ কেজি শুঁটকি পর্যটকরা কিনে নেন। তাতে কোনো রাজস্ব পায় না সরকার। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দুবলায় উৎপাদিত শুঁটকির প্রতি কেজিতে সাড়ে ১১ টাকা সরকারি রাজস্ব রয়েছে। পর্যটকদের কাছে বিক্রি হওয়া শুঁটকির বিশাল অংশ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবছর বনবিভাগ থেকে আমাদের চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

জেলেদের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘দুবলায় বনবিভাগের অনুমোদিত ৫-৬শ অস্থায়ী ঘর রয়েছে। এতে নৌকা আছে এক হাজার থেকে ১২শ। দুবলায় যাওয়া ৯০ শতাংশ জেলের নিজেদের কোনো মূলধন নেই। ব্যবসায়ী, পাইকার ও সমিতি-এনজিও থেকে জেলেদের অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। আগের বছরগুলোতে পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রিতে অরাজকতা ছিল। বেশি দাম নিতো। সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য এবার জেলেদের সরাসরি শুঁটকি বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

‘অন্যখাতে বনবিভাগকে আলাদা টাকা দিতে হলেও পর্যটকদের কাছে বিক্রি শুঁটকিতে আলাদা টাকা দিতে হয় না বলে দাবি করেন তিনি। বলেন- ‘প্রতি কেজি শুঁটকিতে খরচ বাদে ১০০ টাকা লাভ থাকলে হয়। সে হিসাবে দোকানের লোকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে কথা হলে বনবিভাগের দুবলা জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘এখানে আগে থেকেই আটটি ট্রান্সপোর্ট ছিল। এবছর থেকে পর্যটকদের মধ্যে ট্রান্সপোর্টগুলোর মাধ্যমে শুঁটকি বিক্রি করা হচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে বনবিভাগ থেকে এর মধ্যে চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে সাড়ে ১১ টাকা রাজস্ব আসে। পর্যটকরা শুঁটকি কিনলে দোকানগুলোতে রসিদ দেওয়া হয়। রসিদ বইগুলো বনবিভাগ থেকে যাচাই করে দেওয়া হয়। বই থেকে হিসাব করে রাজস্ব আদায় করা হয়।’ তবে বেশি দামে শুঁটকি বিক্রির বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।

বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘ওখানে শুঁটকি কেনাবেচার জন্য অনেকের আগে থেকেই পারমিট আছে। এবার শুধু খুচরা বিক্রির জন্য দোকানগুলো দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা শুঁটকির রাজস্ব আমাদের দেন। এর বাইরে কোনো সুবিধা বনবিভাগ নেয় না।’

দোকানগুলোতে বাজারের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নিতে পারেন- এমন আশঙ্কার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘তারা অতিরিক্ত দাম নিলেও নিতে পারেন। কিন্তু রাজস্বের বাইরে আমরা কিছু দেখি না। যে দোকানগুলো বসেছে, তারা তারাই (ট্রান্সপোর্ট মালিক) আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন যেহেতু একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ আসছে, সেখানে আরও কিছু দোকান বসানোর কথা বলবো।’