শেয়ার বাজার

গণধর্ষণের আলামত দেখতে ধর্ষিতাকে কাপড় খুলতে বলায় ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: বুধবার, ৩ এপ্রিল ২০২৪

গণধর্ষণের আলামত দেখতে ধর্ষিতাকে কাপড় খুলতে বলায় ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

ভারতে এক ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের আলামত দেখতে ধর্ষিতাকে গায়ের কাপড় খুলতে বলার অভিযোগ উঠেছে। দলিত সম্প্রদায়ের ওই নারী এরপর বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানান। পরে ওই ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।

বুধবার (৩ এপ্রিল) ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, দেশটির রাজস্থানের কারাওলি বিভাগের হিন্দুয়ান কোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট ধর্ষিতা তরুণীকে এমন কথা বলেন। পুলিশের ডেপুটি এসপি (এসটি-এসসি) সেল মিনা মীনা বলেছেন, গত ৩০ মার্চ ওই তরুণী হিন্দুয়ান কোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

অভিযোগে ভুক্তভোগী জানান, ধর্ষণের ক্ষত (আলামত) দেখার জন্য তাকে শরীরর কাপড় খুলতে বলা হয়। তবে তিনি এতে অস্বীকৃতি জানান এবং ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় আপত্তিজনক আবেদনের প্রেক্ষিতে অভিযোগ দায়ের করেন। তার বিরুদ্ধে ভারতের অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মার্চ ধর্ষণের শিকার হন ভুক্তভোগী তরুণী। পরে ২৭ মার্চ এ ঘটনায় হিন্দুয়ান সদর পুলিশ স্টেশনে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। ধর্ষণের পর বিচার চাইতে গিয়ে এ ধরনের বিড়ম্বনা দেখে অনেকে বিচার না চেয়েই চুপ হয়ে যান।

ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৩

ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ফিলিস্তিনিদের রক্তাক্ত ইতিহাসে ১৪ই মে, ২০১৮ ছিল আরেকটি বিষাদময় দিন। যুক্তরাষ্ট্র সেদিন জেরুসালেমে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করছিল। আর সেদিন গাজা পরিণত হয়েছিল এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের হিসেব অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে সেদিন গাজায় নিহত হয় ৫৮ জন। আহত হয় আরও প্রায় তিন হাজার। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর এক দিনে এত বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি।

সেই দিনটি ছিল ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। ১৯৪৮ সালের এই দিনটিতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে দিনটি হচ্ছে 'নাকবা' বা বিপর্যয়ের দিন। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেদিন ইসরায়েলে তাদের বাড়ী-ঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। প্রতিবছর দিনটিকে তারা 'নাকবা' দিবস হিসেবেই পালন করেন।

যুক্তরাষ্ট্র যে তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে এসেছে, সেটিও খুবই বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে এই পদক্ষেপ নেয়ার পর তা ফিলিস্তিনিদের মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে।

ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী। অন্যদিকে ইসরায়েল পুরো জেরুসালেম নগরীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে কার্যত ইসরায়েলিদের অবস্থানকেই সমর্থন জানাচ্ছে বলে মনে করে ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ আট দশকের এই সংঘাত বুঝতে সাহায্য করতে পারে নীচের দশটির প্রশ্নের উত্তর:


১. কীভাবে এই সংঘাতের শুরু?

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদীরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেখান থেকেই 'জাওনিজম' বা ইহুদীবাদী আন্দোলনের শুরু। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র পত্তন করা।

সেই সময় প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ছিল তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। এটি মুসলিম, ইহুদী এবং খ্রিস্টান- এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত।

ইহুদীবাদী আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইউরোপের ইহুদীরা দলে দলে প্যালেস্টাইনে গিয়ে বসত গাড়তে শুরু করে। কিন্তু তাদের এই অভিবাসন স্থানীয় আরব এবং মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সেসময় আরব এবং মুসলিমরাই ছিল সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্য কার্যত ভেঙ্গে পড়ে। তখন যে লিগ অব নেশন' গঠিত হয়েছিল, সেই বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে 'ম্যান্ডেট' দেয়া হয় প্যালেস্টাইন শাসন করার।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল তখন ব্রিটেন আরব এবং ইহুদী, উভয় পক্ষের কাছেই নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যালেস্টাইন নিয়ে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনটিই ব্রিটেন রক্ষা করেনি।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন কার্যত ভাগ-বাটোয়োরা করে নিয়েছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্স। এই দুই বৃহৎ শক্তি পুরো অঞ্চলকে তাদের মতো করে ভাগ করে নিজেদের প্রভাব বলয়ে ঢোকায়।

প্যালেস্টাইনে তখন আরব জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদীবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। ইহুদী এবং আরব মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে লাখ লাখ ইহুদীকে হত্যা করা হয় (হলোকাস্ট) তার পর ইহুদীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় চাপ বাড়তে থাকে।

ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলটি তখন ফিলিস্তিনি আর ইহুদীদের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল।

কিন্তু পরদিনই মিশর, জর্দান, সিরিয়া এবং ইরাক মিলে অভিযান চালায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলে। সেটাই ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ইহুদীদের কাছে এটি স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।

জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনে আরবদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে অঞ্চলটি বরাদ্দ করেছিল, এই যুদ্ধের পর তার অর্ধেকটাই চলে যায় ইসরায়েল বা ইহুদীদের দখলে।

ফিলিস্তিনের জাতীয় বিপর্যয়ের শুরু সেখান থেকে। এটিকেই তারা বলে 'নাকবা' বা বিপর্যয়। প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে হয়। ইহুদী বাহিনী তাদেরকে বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে।

কিন্তু আরব আর ইসরায়েলিদের মধ্যে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধ মাত্র। তাদের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সূচনা হলো মাত্র।

১৯৫৬ সালে যখন সুয়েজ খাল নিয়ে সংকট তৈরি হয়, তখন ইসরায়েল মিশরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু সেই সংকটে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ব্রিটেন, ইসরায়েল আর ফ্রান্সকে পিছু হটতে হয়। ফলে যুদ্ধের মাঠ কোন কিছুর মীমাংসা সেই সংকটে হয়নি।

এরপর এলো ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ৫ই জুন হতে ১০ই জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধে যা ঘটেছিল, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল পরবর্তীকালে।

ইসরায়েল বিপুলভাবে জয়ী হয় এই যুদ্ধে। তারা গাজা এবং সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয় যা কীনা ১৯৪৮ সাল হতে মিশরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে পূর্ব জেরুসালেম-সহ পশ্চিম তীরও তারা দখল করে নেয় জর্দানের কাছ থেকে। সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে গোলান মালভূমি। আরও পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে পালাতে হয়।

আরব-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে এর পরের যুদ্ধটি 'ইয়োম কিপুর' যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের এই যুদ্ধের একদিকে ছিল মিশর আর সিরিয়া, অন্যপক্ষে ইসরায়েল। মিশর এই যুদ্ধে সিনাই অঞ্চলে তাদের কিছু হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে। তবে গাজা বা গোলান মালভূমি থেকে ইসরায়েলকে হটানো যায়নি।

কিন্তু এই যুদ্ধের ছয় বছর পর ঘটলো সেই ঐতিহাসিক সন্ধি। মিশর প্রথম কোন আরব রাষ্ট্র যারা ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করলো। এর পর তাদের পথ অনুসরণ করলো জর্দান।

কিন্তু তাই বলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হলো না। গাজা ভূখন্ড যেটি বহু দশক ধরে ইসরায়েল দখল করে রেখেছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে তারা ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে দিল। সেখানে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরণের লড়াই হয় ২০০৮, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে।

২. মধ্যপ্রাচ্যে কেন ইসরায়েলে প্রতিষ্ঠা করা হয়?

ইহুদীরা বিশ্বাস করে বাইবেলে বর্ণিত পিতৃপুরুষ আব্রাহাম এবং তার বংশধরদের জন্য যে পবিত্রভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, আজকের আধুনিক ইসরায়েল সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই অবশ্য এই ভূমি নিয়ে সংঘাত চলছে। আসিরিয়ান, ব্যাবিলোনিয়ান, পার্সিয়ান, ম্যাসিডোনিয়ান এবং রোমানরা সেখানে অভিযান চালিয়েছে, সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। রোমানরা সেখানে 'জুডেয়া' বলে একটি প্রদেশ তৈরি করেছিল।

তবে এই 'জুডেয়া' প্রদেশের ইহুদীরা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করেছেন। রোমান সম্রাট হাড্রিয়ানের আমলে ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে এক বিরাট জাতীয়তাবাদী ইহুদী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। তিনি সে দমন করেন। এরপর তিনি জুডেয়া এবং রোমানদের অধীন সিরিয়াকে যুক্ত করে তৈরি করেন এক নতুন প্রদেশ, যার নাম দেয়া হয় সিরিয়া-প্যালেস্টাইন।

এসব যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে সেখানে ইহুদীদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। সেখানে ইহুদীদের ব্যাপক হারে হত্যা করা হয়। অনেকে নির্বাসিত হয়। অনেক ইহুদীতে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।

অস্টম শতকে যখন ইসলামের উত্থান ঘটলো, প্যালেস্টাইন জয় করলো আরবরা। এরপর অবশ্য ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা সেখানে অভিযান চালায়। ১৫১৬ সালে এই এলাকায় শুরু হয় তুর্কি আধিপত্য। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই অঞ্চলটি এক নাগাড়ে শাসন করেছে তারা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লীগ অব নেশন্স প্যালেস্টাইন তুলে দেয় ব্রিটিশদের হাতে। সেখানে ব্রিটিশ শাসন চলেছে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে যে ইহুদী নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) চলে, তার শিকার হন লাখ লাখ ইহুদী। একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর স্বীকৃতির জন্য তখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে।

কিন্তু আরব আর ইহুদীদের মধ্যে এ নিয়ে যে বিরোধ, ব্রিটিশরা তার কোন সমাধান করতে পারছিল না। তারা বিষয়টি নিয়ে জায় জাতিসংঘে। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার জন্য জাতিসংঘ একটি বিশেষ কমিশন গঠন করে।

১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্যালেস্টাইন ভাগ করার এক পরিকল্পনা অনুমোদন করে। এই পরিকল্পনায় একটি আরব এবং একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল আর জেরুসালেম নগরীর জন্য একটি বিশেষ কৌশল গ্রহণের কথা বলা হয়।

পরিকল্পনাটি মেনে নিয়েছিল ইসরায়েল, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছিল আরবরা। এই পরিকল্পনাকে আরবরা দেখছিল তাদের ভূমি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে।

কিন্তু প্যালেস্টাইনের ওপর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার মাত্র একদিন আগে ইহুদীরা ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিল।

পরের দিনই ইসরায়েল জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন জানালো, যা গৃহীত হলো এক বছর পর। জাতিসংঘের ১৯২ টি দেশের ১৬০টি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

৩. ফিলিস্তিনরা দুটি আলাদা ভুখন্ডে ভাগ হয়ে আছে কেন?

১৯৪৭ সালে প্যালেস্টাইন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছিল একটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে "পশ্চিম গ্যালিলি, সামারিয়া এবং জুডেয়ার পার্বত্য অঞ্চল, তবে জেরুসালেম নগরী এবং মিশর সীমান্ত পর্যন্ত ইসডুডের উপকূলীয় সমভূমি এর মধ্যে পড়বে না।"

কিন্তু আজকের ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের বিভাজন মূলত নির্ধারিত হয়েছে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির রেখা বরাবর।

ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীর (৫,৯৭০ বর্গ কিলোমিটার) এবং গাজা ভূখন্ড (৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার) হচ্ছে দুটি প্রধান ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকা। এই দুই ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের সবচেয়ে নিকটবর্তী দুটি এলাকার মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।

ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীরকে এই নামে ডাকা হয় কারণ এটি জর্দান নদী এবং ডেড সীর পশ্চিম তীরে। জেরুসালেম পর্যন্ত এর বিস্তার। যে জেরুসালেম নগরীকে কীনা ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি- উভয়েই তাদের রাজধানী বলে দাবি করে।

পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করে ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার। ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি দল ফাতাহ এই ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষের মূল শক্তি বা দল।

আর গাজার সঙ্গে রয়েছে ইসরায়েলের ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। মিশরের সঙ্গেও গাজার ৭ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। গাজার অন্যদিকে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূমধ্যসাগর উপকূল।

গাজা এখন নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল হামাস। অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে হামাস তাকে স্বীকৃতি দেয় না।

৪. ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিরা কি কখনো কোন শান্তি চুক্তি করেছে?

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেল, তখন ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে পশ্চিম তীর এবং গাজায়। সেখানে ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন দলে সংগঠিত হয়ে সংগ্রাম শুরু করে। গাজা নিয়ন্ত্রণ করতো মিশর। আর পশ্চিম তীর ছিল জর্দানের নিয়ন্ত্রণে। অন্য কিছু আরব দেশেও ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় শিবির তৈরি হয়।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু আগে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো মিলে গঠন করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গেনাইজেশন (পিএলও)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল ছিল ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহ। পিএলও গঠিত হওয়ার পর এর বাহিনী ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ শুরু করে। প্রথমে তারা হামলা চালায় জর্দান থেকে। এরপর লেবানন থেকে।

ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের নানা ধরণের টার্গেট লক্ষ্য করে এই হামলা চালায়। ইউরোপেও ছিল কিছু টার্গেট। বিমান, দূতাবাস থেকে শুরু করে ইসরায়েলি অ্যাথলীটদের ওপর হামলা চলে।

ফিলিস্তিনিরা একের পর এক ইসরায়েলি টার্গেটে হামলা করছিল। আর ইসরায়েল আবার পাল্টা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছিল টার্গেট করে। দুপক্ষের এই 'যুদ্ধ' চলে বহু বছর ধরে।

এরপর ১৯৯৩ সালে পিএলও এবং ইসরায়েল একটি শান্তি চুক্তিতে সই করে। অসলো শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত এটি। পিএলও সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের পথ পরিহার করে ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে এবং শান্তির অঙ্গীকার করে। তবে হামাস কখনোই এই চুক্তি মানেনি।

চুক্তি অনুসারে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে তাদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করে। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইসরায়েল এই প্রতিশ্রুতি কখনোই বাস্তবায়ন করেনি। তারা বরং অধিকৃত এলাকায় ইহুদী বসতি গড়ে তোলে।

এই ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তি চুক্তির অধীনেই গঠিত হয়েছিল 'প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটি' বা ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার।

সরাসরি ভোটে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।

জেরুসালেম যদিও ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্যতম উৎস, তারপরও এই অসলো শান্তি চুক্তিতে জেরুসালেমের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

২০১৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ঘোষণা দেন, তারা আর এই শান্তি চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নন, কারণ ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে চলেনি। তিনি আরও বলেন, একটি দখলদারি শক্তি হিসেবে এখন সবকিছুর দায়িত্ব ইসরায়েলের ঘাড়েই বর্তাবে।

৫. ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্য বিরোধের মূল বিষয়গুলো কী?

একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব, পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি নির্মাণ অব্যাহত রাখা এবং ফিলিস্তিনি ও ইহুদী এলাকার মধ্যে নিরাপত্ত প্রাচীর তৈরি করা--এগুলি শান্তি প্রক্রিয়াকে বেশি জটিল করে ফেলেছে। যদিও দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।

কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে শান্তির পথে এগুলোই একমাত্র বাধা নয়। বিল ক্লিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তখন ক্যাম্প ডেভিডে ২০০০ সালে তিনি যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেখানে এর ব্যর্থতার আরও অনেক কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত সেই বৈঠকে একমত হতে পারেননি আরও অনেক বিষয়ে।

যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য:

জেরুসালেম: ইসরায়েল দাবি করে জেরুসালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। এরপর থেকে তারা জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে চায়।

সীমান্ত এবং এলাকা নিয়ে বিরোধ: ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। ইসরায়েল এটা মানতে নারাজ।

ইহুদী বসতি: ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদী বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমেই এখন বসতি গেড়েছে পাঁচ লাখের বেশি ইহুদী।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী: ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। এরা ইসরায়েলের ভেতর তাদের বাড়ীঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। পিএলও'র হিসেবে এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাদের আশংকা, এত বিপুল সংখ্যাক ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলে ফিরে আসে, তাদের রাষ্ট্রের ইহুদী চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না।

৬. ফিলিস্তিন কি কোন দেশ?

২০১২ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব ভোটে পাশ হয়। এতে ফিলিস্তিনিদের 'নন মেম্বার অবজারভার স্টেট' বা পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়।

এর ফলে ফিলিস্তিনিরা এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তারা জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠাগুলোর কাজেও অংশ নিতে পারে।

২০১১ সালে অবশ্য একটি পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আপত্তির কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

কিন্তু জাতিসংঘের স্বীকৃতি না মিললেও এই বিশ্ব সংস্থার ৭০ ভাগ সদস্য রাষ্ট্রই ফিলিস্তিনকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। (সাধারণ পরিষদের ১৯২ টি দেশের ১৩৪টি দেশ)।

২০১৫ সালের সেপেম্বরে জাতিসংঘ সদর দফরের বাইরে ফিলিস্তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলনেরও স্বীকৃতি মিলে।

৭. যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলের প্রধান মিত্র? আর ফিলিস্তিনের সমর্থক কারা?

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের পক্ষে রয়েছে খুবই ক্ষমতাধর একটি লবি। সেখানে জনমতও ইসরায়েলের পক্ষে। এর ফলে কোন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইসরায়েলেও ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়া কঠিন।

২০১৩ সালে বিবিসি ২২টি দেশে একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপে দেখা যায়, পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে একমাত্র দেশ, যেখানে জনমত ইসরায়েলের পক্ষে সহানুভূতিশীল।

শুধু তাই নয়, এই দুইদেশ ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সাহায্য পায় ইসরায়েল। এই সাহায্যের একটা বড় অংশই খরচ হয় ইসরায়েলের জন্য সামরিক অস্ত্র কেনার জন্য।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে খোলাখুলি সমর্থন যোগানোর মতে একটি বৃহৎ শক্তিও নেই।

ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এক সময় মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। কিন্তু মিশরের সেনাবাহিনী ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যূত করার পর সেখান থেকে হামাস আর কোন সমর্থন পায় না।

হামাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এখন সিরিয়া, ইরান এবং লেবাননের হেযবোল্লাহ গোষ্ঠী। ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল বিশ্বের আরও অনেক দেশ। কিন্তু এই সহানুভূতি কাজে পরিণত হয় কম।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন যে অস্থিরতা, তার কারণেও ফিলিস্তিনিদের ইস্যুটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরে গেছে।

৮. ফিলিস্তিনি এলাকায় সর্বশেষ দফা সহিংসতার পেছনে কি?

কিছুদিনের তুলনামূলক শান্তির পর গত ১৪ই মে, ২০১৮ হতে আবার ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়েছে গাজায়। সেদিন অন্তত ৫৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয় ইসরায়েলি হামলায়। আহত হয় তিন হাজারের বেশি।

গত ছয় সপ্তাহে একশোর বেশি ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলি এবং বোমায় নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা তাদের এই বিক্ষোভের নাম দিয়েছে 'গ্রেট মার্চ টু রিটার্ন'। অর্থাৎ নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার মিছিল।

১৪ই মে ছিল ‌ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। আর ফিলিস্তিনিরা সেই দিনটি পালন করে 'নাকবা' বা বিপর্যয় হিসেবে। কারণ ঐ দিনই প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলের ভেতর থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাদের বাড়িঘর ফেলে।

আর ঠিক এরকম এক স্পর্শকাতর দিনেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস সরিয়ে নিচ্ছিল জেরুসালেমে। এটি ফিলিস্তিনিদের সাংঘাতিক ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী। আর যুক্তরাষ্ট্রে তাদের দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নিয়ে কার্যত পুরো নগরীরর ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছে।

৯: তাহলে কি এখন আমরা আরেকটি 'ইন্তিফাদা'র সূচনা দেখছি?

ফিলিস্তিনিরা এর আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুটি গণঅভ্যুত্থান বা 'ইন্তিফাদা' ঘটিয়েছে। প্রথমটি ১৯৮০র দশকে। পরেরটি ২০০০র এর শুরুর বছর গুলিতে।

১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনিরা ছিল কার্যত নিরস্ত্র। ফিলিস্তিনি তরুণ এবং কিশোররা পাথর ছুড়ে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবেলা করছে, এই দৃশ্য অনেক ছবিতেই দেখা যাবে।

২০০০ সাল হতে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ইন্তিফাদা ছিল অনেক বেশি রক্তাক্ত। তিন হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয় সেই সময়। ইসরায়েলিদেরও হারাতে হয় এক হাজার সৈন্য।

গাজায় সম্প্রতি যে বিক্ষোভ দেখা গেছে তা সেখানে ধূমায়িত হতে থাকা ক্ষোভ এবং হতাশার বহিপ্রকাশ বলে মনে করা হয়। কারণ শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে ব্যাপকভাবে হতাশ ফিলিস্তিনিরা।

শতাধিক ফিলিস্তিনির প্রাণহানির পর এখন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় কীনা, সে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের ধারণা, এটি গাজা থেকে পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

১০. কী ঘটলে দুপক্ষের মধ্যে টেকসই শান্তি আসবে?

ফিলিস্তিনিদের দিক থেকে দেখলে, এজন্যে প্রথমেই ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকার করে নিতে। এতে হামাসও থাকবে। গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনেদের চলাফেরার ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি হচ্ছে,এজেন্য আগে সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে সহিংসতার পথ ত্যাগ করতে হবে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

এরপর রয়েছে সীমানা এবং ভূমি নিয়ে বিরোধ। আছে ইহুদী বসতি এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রশ্ন।

এসব প্রশ্নেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার দরকার হবে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেক কিছু্ই বদলে গেছে। বিশেষ করে আরব এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে অনেক যুদ্ধের পর বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলির চেহারাই পাল্টে গেছে।

ইসরায়েল যেহেতু অধিকৃত অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণে, তাই এর ভিত্তিতেই দরকষাকষি করতে চায় তারা। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা দাবি করছে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে যে সীমানা ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতেই তাদের রাষ্ট্র হবে।

আর পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যে অবৈধ বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে, সেটা নিয়ে নীরব লড়াই তো চলছেই।

তবে সবচেয়ে জটিল বিষয় মনে হয় জেরুসালেম নগরীর প্রতীকি গুরুত্ব।

পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা হামাস, উভয়েই চায় পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী। যদিও ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল হতে এটি দখল করে রেখেছে।

এই বিরোধের নিরসন ছাড়া হয়তো একটা চূড়ান্ত সমাধান কোনদিনই সম্ভব হবে না। অন্যান্য বিরোধের ক্ষেত্রে হয়তো আপোসের জায়গা আছে, কিন্তু জেরুসালেমের বেলায় নেই।

আর মৃতপ্রায় শান্তিপ্রক্রিয়াকে যে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে, সেটাও মনে হচ্ছে না।

সত্যি কথা বলতে কি, সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই পুরোনো বিরোধের মীমাংসার জন্য এত কম চেষ্টা আর কখনো দেখা যায়নি।

আর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু - এই দুজনের কেউই যে চুক্তিতে পৌছানোর জন্য দরকারি কোন ছাড় দেবেন--সেটা কেউই বিশ্বাস করেন না।


আল-আকসা মসজিদ
আল-আকসা মসজিদ মুসলিমদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৩

আল-আকসা মসজিদ মুসলিমদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মক্কা ও মদিনার পর জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদকে ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি বছর ফিলিস্তিন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মুসলিম আসেন এই মসজিদ প্রাঙ্গণে। মসজিদটি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।

গত কয়েক বছর ধরে আল আকসা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি বাহিনী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।কিন্তু এই এলাকাটি এত স্পর্শকাতর কেন? এর জন্য ফিরে তাকাতে হবে এর ইতিহাসের দিকে।

আল আকসা চত্বরে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্থাপনা। যার কোনটি মুসলমানের জন্য, কোনটি ইহুদিদের জন্য আবার কোনটি খ্রিস্টানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর সবগুলো্ স্থাপনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তিনটি ধর্মের ইতিহাস।

আল আকসা কোথায় অবস্থিত?

১৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে অবস্থিত আল -আকসা প্রাঙ্গণে রয়েছে আল-আকসা মসজিদ, যা কিবলি মসজিদ নামেও পরিচিত। এছাড়াও আছে সোনালী গম্বুজবিশিষ্ট ‘ডোম অফ দ্য রক’, যা জেরুসালেমের সবচেয়ে স্বীকৃত একটি ল্যান্ডমার্ক এবং এই দুটিই পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।

পূর্ব জেরুসালেমের পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত আল-আকসা মুসলিমদের কাছে ‘হারাম আল-শরীফ’ নামে পরিচিত এবং ইহুদিদের কাছে পরিচিত ‘টেম্পল মাউন্ট’ হিসেবে। এখানে ১৫টি গেট ছিল, যেদিক দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করতো জেরুজালেমের ওল্ড সিটি থেকে আসা ধর্মানুরাগীরা ।

যদিও এই গেটের মাত্র ১০টি এখন ব্যবহৃত হয় এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশ।

আল-আকসায় প্রথম ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর, পরে ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম বড় আকারে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। দু'দফা ভুমিকম্পে দুবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা পরে পুন:নির্মাণ করা হয়। কয়েকবার সংস্কার কাজও করা হয়। জেরুসালেমের ওল্ড সিটির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত আল-আকসার ‘ডোম অফ দ্য রক’ শহর জুড়ে দৃশ্যমান। বাইরের দেয়ালসহ এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার বর্গমিটারের এই সীমানায় রয়েছে মসজিদ, নামাজের ঘর, উঠান ও ধর্মীয় বিভিন্ন স্থাপনা।

আল আকসা অর্থ কী?

আরবি ভাষায়, আল-আকসার দুটি অর্থ রয়েছে: ‘সবচেয়ে দূর’, যা মক্কা থেকে এর দূরত্বকে বোঝায়। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ‘সর্বোচ্চ’ হিসেবেও মুসলিমদের কাছে এর মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আল আকসা মসজিদটি 'মসজিদুল আকসা' বা 'বাইতুল মুকাদ্দাস' নামে পরিচিত মুসলিমদের কাছে।

মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, নবী মুহাম্মদ মিরাজের রাতে কাবা শরিফ থেকে প্রথমে আল আকসায় এসেছিলেন এবং মিরাজে গমনের আগে এখানে সব নবীদের সঙ্গে নামাজের সময় ইমাম হিসেবে নামাজ আদায় করেন।

আল আকসা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রাঙ্গণের যেমন ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের সংস্কৃতি ও জাতীয়তার প্রতীকও এটি। সোনালী গম্বুজের ‘ডোম অফ দ্য রক’ সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে স্বীকৃত এবং এই স্থানে প্রার্থনা করতে আসতে পারা একটি বড় সুযোগ বলে মনে করেন মুসলিমরা।

বর্তমান সীমানাগুলো তৈরি হবার আগের বছরগুলোতে, সেই পুরনো আমলে মুসল্লিরা পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেও সেই সফরে জেরুসালেমকেও অন্তর্ভুক্ত করতেন ।

আল-আকসার বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ এখনও হাজার হাজার ধর্মানুরাগীকে আকৃষ্ট করে, যারা প্রতি শুক্রবার জামাতে নামাজের জন্য জড়ো হন।

আল-আকসা প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি। মিরাজের রাতে এই মসজিদেই নামাজ আদায় করেছিলেন নবী মুহাম্মদ (সা:)। মক্কায় হজ ও ওমরা পালনের আগে আল আকসা ছিল মুসলিমদের কাছে প্রধান ধর্মীয় স্থান।

ইহুদিরা বিশ্বাস করে, ‘টেম্পল মাউন্টেই’ তাদের পয়গম্বর আব্রাহাম তার পুত্র ইসমাইলকে উৎসর্গ করার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য ইহুদিদের পয়গম্বর আব্রাহাম ইসলাম ধর্মে নবী ইব্রাহিম হিসেবে পরিচিত।

ইহুদিরা বিশ্বাস করে, এখানেই ছিল ইহুদিদের প্রথম ও দ্বিতীয় পবিত্র উপাসনালয়। তারা মনে করে, তিন হাজার বছর আগে রাজা সোলেমান এখানে প্রথম উপাসনালয় নির্মাণ করেছিল। যেটি ধ্বংস করেছিল ব্যাবিলনীয়রা।

আর দ্বিতীয় উপাসনালয়টি ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান বাহিনী ধ্বংস করে দেয়। এখানে একটি খ্রিস্টান ব্যাসিলিকাও ছিল যা একই সাথে ধ্বংস হয়। সেই উপাসনালয়ের শুধুমাত্র পশ্চিম দিকের দেয়ালটিই এখনো টিকে আছে এবং এটিই ইহুদিদের প্রার্থনার স্থান।

ইহুদিদের মতে, আল আকসায় ‘ফাউন্ডেশন স্টোন’ বা বিশ্বের ‘ভিত্তি পাথর’ এর অবস্থান। যেখান থেকে বিশ্বের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল বলে তারা বিশ্বাস করে।

অন্যদিকে খ্রিস্টানরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এটাই সেই জায়গা যেখানে যীশু খ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন আর এখানকার গুহাতেই তার দেহ রাখা হয়েছিল।

ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে জেরুজালেম ও পশ্চিমতীর দখল করে নেবার আগে এটি নিয়ন্ত্রণ করতো জর্ডান। এখন পূর্ব জেরুজালেম ইসরায়েল অধিকৃত হলেও আল-আকসা বা টেম্পল মাউন্ট এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করে জর্ডান-ফিলিস্তিনের একটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান।

‘ডোম অফ দ্য রক’

জেরুজালেমের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডমার্ক রয়েছে আল আকসায় এবং ইসলামিক যুগের প্রারম্ভিক পর্যায়ের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই প্রাঙ্গণে।

ধর্মীয় ভবন, বিভিন্ন ধরনের গম্বুজ, মিনার, স্তম্ভের ঐতিহাসিক কাঠামো ছাড়াও রয়েছে ৩০টি পানির উৎস, যার মধ্যে অজু করার জন্য ব্যবহৃত কূপও রয়েছে।

ইসলামি স্থাপত্যের প্রাচীন নমুনার দেখা মেলে আল আকসায়। আল আকসার দেয়ালের অভ্যন্তরে রয়েছে মিম্বার। এবং মামলুক ও আইয়ুবী যুগের ঐতিহাসিক বিদ্যালয়ের নিদর্শনও আছে এখানে।

আরবি ভাষায়, ‘ডোম অফ দ্য রক’কে ‘কুব্বাত আল-সাখরা’ বলা হয় যেটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

মক্কার আগে মুসলিমরা এই স্থানকে কিবলা হিসেবে ব্যবহার করতেন অর্থাৎ এর দিকে ফিরেই নামাজ পড়তেন তারা।

উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে ৬৯২ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয় অষ্টকোণ বিশিষ্ট এই স্থাপনা ‘ডোম অফ দ্য রক’।

'হারাম আল শরীফ' বা 'টেম্পল মাউন্টের' উপর অবস্থিত সোনালী গম্বুজটি ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম একটি নিদর্শন।

এর মধ্যখানে রয়েছে একটি পাথর, যাকে কেন্দ্র করেই এই স্থাপনা নির্মিত। এজন্যই একে বলে 'কুব্বাত আল-সাখরা’ বা ডোম অফ দ্য রক (পাথরের গম্বুজ)।

ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই পাথর হলো ফাউন্ডেশন স্টোন যা মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। আর ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী ‘ডোম অফ দ্য রকের’ ভেতরে রয়েছে সেই পাথর- যেখান থেকে ইসলামের নবী মুহাম্মদ মিরাজে গিয়েছিলেন (ঊর্ধ্বাকাশে গিয়েছিলেন) বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করেন।

ওয়েস্টার্ন ওয়াল

আল-আকসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ওয়েস্টার্ন ওয়াল, যা আল-বুরাক প্রাচীর নামেও পরিচিত।

মরোক্কোন গেট ও প্রফেট গেট বা বাব আল নাবি গেটের মাঝখানে রয়েছে প্রাচীরটি এবং এই এলাকায় একটি ছোট মসজিদও রয়েছে যা বুরাক মসজিদ নামে পরিচিত, যেটা ১৩০৭ থেকে ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল।

প্রায় ২০ মিটার লম্বা ও ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের প্রাচীরটি নিয়ে মুসলিমদের বিশ্বাস হলো -নবী মুহাম্মদ মিরাজে যাবার আগে আল-বুরাক নামে পরিচিত একটি ডানাওয়ালা ঘোড়ার মতো প্রাণীকে বেঁধে রেখেছিলেন এখানে।

অন্যদিকে টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে থাকা ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ ইহুদিদের কাছে ‘পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর’ হিসেবে স্বীকৃত ও পবিত্র স্থান। চুনাপাথর দিয়ে বানানো প্রাচীন এই দেয়ালটি 'প্লেস অফ উইপিং' বা 'কান্নার জায়গা' নামেও পরিচিত।

ইহুদিরা বিশ্বাস করে যে এটি হেরোডিয়ান উপাসনালয়ের শেষ অবশিষ্ট কাঠামো, যা রাজা হেরোড দ্য গ্রেটের সময় ২০৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্প্রসারিত হয়। রোমানরা ৭০ খ্রিস্টাব্দে ধ্বংস করেছিল এটা।

প্রতি বছর, কয়েক হাজার ইহুদি ওয়েস্টার্ন ওয়ালে জড়ো হন এবং এই দেয়ালটি ধরে প্রার্থনা করেন ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা। দেয়ালের ফাঁক ফোকরে দেখা যাবে অসংখ্য টুকরো টুকরো কাগজ গুঁজে রাখা। সেগুলোর মধ্যে লেখা থাকে এখানে আসা মানুষজনের প্রার্থনা। তারা বিশ্বাস করে এই প্রাচীর হলো সেই জায়গা যেখানে ঈশ্বর সবসময় উপস্থিত থাকেন।

আল কিবলি মসজিদ

আল আকসা মসজিদ কোনও একক মসজিদ নয়। আল আকসা মসজিদ মানে- কিবলি মসজিদ, মারওয়ানি মসজিদ (কুব্বাত-আল-সাখরা) ও বুরাক মসজিদের সমন্বয়।

রূপালি-গম্বুজ বিশিষ্ট আল কিবলি মসজিদটি আল-আকসার দক্ষিণ প্রাচীরের দিকে রয়েছে এবং এটি এই প্রাঙ্গণে মুসলমানদের নির্মিত প্রথম ভবন। এটা এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি এবং এখানে মুসল্লিরা নামাজ পড়েন একজন ইমামের নেতৃত্বে।

মুসলমানরা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করে, তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন আল-খাত্তাব এবং তার সঙ্গীরা মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। তখন কিন্তু এলাকাটি অবহেলিত ছিল।

এটা প্রথমে একটা সাধারণ ভবন ছিল, কাঠের গুঁড়ির ওপর ভিত্তি করে যেটার কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে মসজিটির যে কাঠামো দেখা যায় তা প্রথম নির্মিত হয়েছিল উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের আমলে অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে।

বেশ কয়েকবার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মসজিদটি, যা পরে পুনঃনির্মাণ করা হয়। কয়েকবার সংস্কার কাজও করা হয়। এর শেষ সংস্কার কাজটি হয়েছিল অটোমান আমলে, সে সময়ে সুলতান সুলেমান মসজিদ প্রাঙ্গণের বেশ কয়েকটি সাইট পুনরুদ্ধার করেছিলেন এবং সেখানে কার্পেট ও নানা ধরনের লণ্ঠন স্থাপন করেছিলেন।

বর্তমানে আল-কিবলি মসজিদের নয়টি প্রবেশপথ রয়েছে। পাথর ও মার্বেলযুক্ত স্তম্ভের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। পাথরের স্তম্ভগুলো প্রাচীন, বিশ শতকের গোড়ার দিকে যে সংস্কার কাজ হয়েছিল তখন মার্বেলগুলো যুক্ত করা হয়।

আশি মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৫ মিটার প্রস্থের এই মসজিদটিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

ফিলিস্তিনিদের কাছে গুরুত্ব

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের চেয়েও আল আকসাকে সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র মনে করেন ফিলিস্তিনিরা। যেখানে তারা জমায়েত হয়ে আনন্দ উদযাপন করতে পারেন বা শোক করতে পারেন।

অনেক ফিলিস্তিনি ছোটবেলা থেকে মসজিদে নিয়মিত আসেন এবং তাদের কাছে আল আকসা দেশের সবচেয়ে স্বীকৃত প্রতীক।

রমজান মাসে অনেকেই মসজিদে আসেন রোজা ভাঙার জন্য এবং শুক্রবার এখানে নামাজ আদায় করেন। যদিও ইসরায়েলি বাহিনীর বিধিনিষেধের ওপর নির্ভর করে ফিলিস্তিনিদের আসা যাওয়া।

মসজিদটির প্রতি ফিলিস্তিনিদের যে ভক্তি ও আনুগত্য সেটাকে হুমকি হিসেবে মনে করে ইহুদি কট্টরপন্থীরা যারা এই জায়গায় থার্ড টেম্পল বা ইহুদিদের তৃতীয় উপাসনালয় তৈরি করতে চায়।

ফিলিস্তিনিদের প্রথম জাদুঘর, ‘ইসলামিক মিউজিয়াম’ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে, যেখানে বিরল প্রত্নতাত্ত্বিক ও শৈল্পিক নিদর্শন রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে কুরআনের পাণ্ডুলিপিও।

সহিংসতার কেন্দ্র আল আকসা কেন?

আল আকসা প্রাঙ্গণটি মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টান- তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র স্থান। যুগ যুগ ধরে এই এলাকা ঘিরেই চলছে বিবাদ। বলা যায় ঐতিহাসিকভাবে এটি বিবাদের ইস্যু।

ইসরায়েলি সরকারের সাথে সমঝোতা অনুযায়ী নানা বিধিনিষেধ ও শর্তপূরণের মাধ্যমে - শুধুমাত্র মুসলিমরাই আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢুকে প্রার্থনা করতে পারেন।

অন্যদিকে খ্রিস্টান ও ইহুদিরা আল আকসায় শুধু পর্যটক হিসেবে প্রবেশ করতে পারবেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন তাদের জন্য আল আকসা খোলা এবং দিনে চার ঘণ্টা সময় পাবেন ওই এলাকা ঘুরে দেখার জন্য।

জেরুসালেমে ধর্ম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আল আকসা প্রাঙ্গণ সংঘর্ষ- সহিংসতার একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

ইহুদি দর্শনার্থীরা নিয়ম অমান্য করে আল আকসায় প্রার্থনা করেছে, কেউ প্রকাশ্যে কেউবা মুসলিমের বেশে। নানান সময়ে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় বিক্ষোভ সংঘর্ষ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।

আল-আকসায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারনের এক বিতর্কিত সফরকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় 'ইন্তিফাদা' বা গণঅভ্যুত্থান - যাতে ৪ হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

সম্প্রতি আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি পুলিশের সাথে ফিলিস্তিনিদের আবারও সংঘর্ষ হয়েছে। ফিলিস্তিনে সর্বশেষ এই সহিংসতার ঘটনা এমন সময়ে ঘটে যখন মুসলিমরা রমজান মাস এবং ইহুদিরা পাসওভার হলিডে পালন করছিল।

ইহুদি চরমপন্থীরা তাদের পাসওভার দিবস উপলক্ষে সেখানে একটি ছাগল জবাই করতে পারে - এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়লে মুসল্লিরা রমজানের নামাজের পর সেখানে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে।

খ্রিস্ট ধর্মের শুরুর দিকে এবং রোমানরা ওই স্থানে ইহুদিদের টেম্পল ধ্বংস করে দেওয়ার আগে ইহুদিরা সেখানে ছাগল জবাই করতো।

দুই হাজার বাইশ সালের এপ্রিল মাসেও আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ইসরায়েলি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ইসরায়েলি পুলিশ তখন জানিয়েছিল শুক্রবার নামাজের পর মসজিদ চত্বর থেকে ফিলিস্তিনিরা ইহুদিদের প্রার্থনার স্থান ওয়েস্টার্ন ওয়ালের দিকে পটকা ও পাথর ছুঁড়ে মারার পর পুলিশ আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রবেশ করে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। এমন সময়ে ওই সংঘাতের ঘটনা ঘটে যখন মুসলিমদের পবিত্র রমজান মাস, ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ‘পাসওভার ডে’ ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব ইস্টার একই সাথে পালিত হচ্ছিল।

নয়দিনব্যাপী চলা 'পাসওভার' উৎসবের সময় আল আকসায় ইহুদিদের প্রবেশ অনেক বেড়ে যায়।

এই সময় এমনিতেই আল আকসা প্রাঙ্গণে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করে।

এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে সহিংসতার পর হামাস জেরুজালেমকে লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ে এবং তার জের ধরে ইসরায়েলের সাথে সংঘাত শুরু হয় যা ১১ দিন ধরে অব্যাহত থাকে।

এই জায়গাটি এতই স্পর্শকাতর যে এখানে কোনও সহিংস ঘটনা শেষ পর্যন্ত আরো একটি ইন্তিফাদা ডেকে আনবে কিনা - এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন না।


গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের-আইসিজে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি, ২০২৪

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের-আইসিজে

বার্তাবেলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তবে গাজায় ইসরালের সামরিক অভিযান বন্ধের যে আদেশ দক্ষিণ আফ্রিকা চেয়েছিল, তাতে সায় দেয়নি জাতিসংঘের এ সর্বোচ্চ আদালত।

ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। শুক্রবারের (২৬ জানুয়ারি) এই রায়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার বাহিনী গাজায় আর গণহত্যা চালাবে না ও ‘কথিত’ গণহত্যার প্রমাণ সংরক্ষণ নিশ্চিত করবে।

শুক্রবার গাজা উপত্যকায় গণহত্যা নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার রুল জারি করেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। এতে গাজায় গণহত্যা বন্ধে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে গাজায় ইসরায়েলকে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ আদালত দেননি।

শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) দেওয়া অন্তবর্তীকালীন রায়ে আদালতের প্রেসিডেন্ট মার্কিন বিচারক জে দোঙ্গু বলেন, গাজায় যাতে গণহত্যা না ঘটে সেজন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে নির্দেশ দিচ্ছেন আদালত। একই সঙ্গে গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে ইসরায়েলকেই।

রায়ে আরও বলা হয়, গাজা উপত্যকায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে ও গাজার সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হবে। এছাড়া ইসরায়েলকে এক মাসের মধ্যে গাজায় ত্রাণ পৌঁছানো ও গণহত্যা প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আদালতের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

আইসিজে তার অন্তবর্তীকালীন রায়ে আরও বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার যে অভিযোগ তুলেছে, সেসব অভিযোগের সঙ্গে কিছু বিষয়ের মিল রয়েছে। এ কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এ মামলা চলবে।

আরও পড়ুন: গাজার ক্ষুধার্ত মায়েদের বুকে দুধ নেই, অনাহারে লাখ লাখ শিশু

আইসেজি’র বিচারক জে দোঙ্গু এর আগে বলেছিলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করা মামলায় রায় দেওয়ার ক্ষমতা এই আদালতের রয়েছে ও ইসরায়েলের অনুরোধে আমরা এই মামলা খারিজ করে দেবো না।

গাজায় নির্বচারে হামলা ও গণহত্যার অভিযোগে ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে গত বছরের শেষদিকে আইসিজেতে মামলা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। চলতি মাসের শুরুতে আদালতে মামলাটির দুই দিনের শুনানি হয়।

শুনানিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়, আদালত যেন জরুরি ভিত্তিতে ইসরায়েলকে গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দেন। এছাড়া জেনোসাইড (গণহত্যা) কনভেনশনের আওতায় ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের সুরক্ষার বিষয়টিও যাতে নিশ্চিত করা হয়।

দখলদার ইসরায়েল আদালতকে এই মামলা সরাসরি খারিজ করে দিতে বলেছিল। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছিলেন, তারা আশা করছেন, জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত এই মিথ্যা অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করবেন।

কিন্তু আইসিজের এই রায়ে ইসরায়েলের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। উল্টো আইসিজের ১৭ জনের বিচারক প্যানেলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। শুধু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কার্যকলাপ ও পদক্ষেপ দ্রুত বন্ধের আদেশ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা যা চেয়েছিল তার বেশিরভাগই পূরণ হয়েছে রায়ে। 

সূত্র: আল জাজিরা